২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের বাসিন্দা লোরি ডেনম্যান ভারতের সংস্কৃতি, খাবার ও প্রকৃতির টানে তিন মাসের জন্য ঘুরতে এসেছিলেন। খাবারের মাধ্যমে সংক্রমণ এড়াতে তিনি পুরো সফরে মাংস পরিহার করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু অজান্তেই তিনি এমন এক খাবার গ্রহণ করেন, যা শুকরের ফিতাকৃমির আণুবীক্ষণিক ডিমে সংক্রমিত ছিল।
ভারত ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরার প্রায় তিন বছর পর, ২০১০ সালে লোরি প্রথম তাঁর শরীরে অস্বাভাবিকতা অনুভব করেন। একদিন রেস্তোরাঁর শৌচাগারে তিনি নিজের শরীর থেকে প্রায় এক মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি বের হতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও প্রাথমিক মল পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। সুস্থ বোধ করায় তিনি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেন।
এর এক বছর পর, ২০১১ সাল থেকে লোরির জীবনে আসল দুর্ভোগ শুরু হয়। তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি তিনি প্রথমবারের মতো মারাত্মক খিঁচুনি বা মৃগীরোগের আক্রমণের শিকার হন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর সিটি স্ক্যান ও এমআরআই রিপোর্টে চিকিৎসকেরা বিস্ময়কর তথ্য পান। লোরির মস্তিষ্কে অন্তত ৩৮টি পরজীবী বাসা বেঁধেছিল।
পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে লোরি ‘নিউরোসিস্টাইসারকোসিস’ নামক একটি বিরল মস্তিষ্কের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, সাধারণত কাঁচা বা আধসেদ্ধ শুকরের মাংস, পরজীবীর ডিম দ্বারা দূষিত পানি পান বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। যুক্তরাজ্যে এই রোগটি এতটাই বিরল যে, সাধারণত আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের ছাড়া স্থানীয়দের মাঝে এটি দেখা যায় না।
পরজীবী মারার ওষুধ ও স্টেরয়েড চিকিৎসার পর লোরি সাময়িকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কয়েক বছর তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন—বোনকে নিয়ে নিউজিল্যান্ড ভ্রমণ, ব্রিস্টলে স্থানান্তর, সার্কাস ক্লাস করা এবং হাফ-ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার মতো কার্যক্রমে তিনি ফিরে আসেন। কিন্তু এই স্বস্তি বেশিদিন টেকেনি। কর্মক্ষেত্রে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান তিনি। স্ক্যান করে দেখা যায়, মস্তিষ্কের পরজীবীগুলোর চারপাশে প্রচণ্ড ফোলা ভাব তৈরি হয়েছে।
এরপর থেকেই লোরির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। স্টেরয়েডের প্রভাবে তাঁর বাহ্যিক চেহারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং তীব্র বিষণ্নতা, প্যারানয়া ও সাইকোসিসের মতো গুরুতর মানসিক রোগ দেখা দেয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তাকে টানা ছয় সপ্তাহ নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে কাটাতে হয়। লোরির দীর্ঘ ২০ বছরের বান্ধবী নিকোলা ব্রাউন সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, হাসপাতালে লোরি পুরোপুরি একটি শিশুর মতো আচরণ করছিল।
তবে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর লোরি আবার তাঁর সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নেন। ২০১৮ সালে ইন্টেরিয়র ডিজাইনিংয়ে ডিগ্রি নেন এবং ২০২২ সালে পুরোদমে কাজে ফেরেন।
লোরির চিকিৎসক ও সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ ড. ব্রেন্ডন হিলি জানান, তাঁর পুরো কর্মজীবনে এটিই একমাত্র ও সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ঘটনা। যুক্তরাজ্যের এবং যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ বিশেষজ্ঞরা লোরির এই কেসটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এটি এতটাই বিরল যে, দেশের অনেক সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ তাঁদের পুরো জীবনেও এমন একটি রোগী দেখার সুযোগ পাবেন না।
বর্তমানে লোরির মস্তিষ্কের সেই ৩৮টি পরজীবী চিকিৎসার মাধ্যমে মারা গেছে এবং সেগুলো এখন ক্যালসিফাইড (নিষ্ক্রিয় পাথরের মতো) অবস্থায় রয়েছে। ২০১৭ সালের পর তাঁর আর কোনো খিঁচুনি হয়নি, তবে সতর্কতাস্বরূপ জীবনের বাকিটা সময় তাঁকে মৃগীরোগের ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। ৪২ বছর বয়সী লোরি বর্তমানে কার্ডিফে বসবাস করছেন। নিজের এই ভয়ানক অভিজ্ঞতাকে পেছনে ফেলে তিনি এখন মানুষের মাঝে এই বিরল রোগটি নিয়ে সচেতনতা ছড়াতে চান। লোরি বলেন, ‘আমি আবার বেঁচে আছি, সুস্থ আছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। জীবনকে এখন আমি প্রতি মুহূর্তে উপভোগ করি।’




