সিডনির বাংলাদেশি সমাজ: বৈচিত্র্যের মাঝে এক অনন্য বাস্তবতা:
জাকির হোসাইন জীবন, সিডনী
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি দিন দিন আকারে যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন পেশা, শিক্ষা ও জীবনধারার বাংলাদেশী মানুষ একসঙ্গে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী, মধ্যম পর্যায়ের শিক্ষিত মানুষ এবং এমন কিছু মানুষও আছেন, যারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি এগিয়ে না থাকলেও সমাজের অংশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন।
এই প্রবাসী সমাজকে দীর্ঘ ২৬ বছর খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে যা দেখতে পেলাম, একেকটি গোষ্ঠীর আগ্রহ ও ব্যস্ততার ক্ষেত্রও একেক রকম। একটি বড় অংশ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, আইটি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী কিংবা অন্যান্য পেশাগত কাজে তারা ব্যস্ত থাকেন। তারা নিজেদের কর্মজীবন, হলিডে উদযাপন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই অধিকাংশ সময় কাটান।
আরেকটি অংশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশের রাজনীতি। দেশের ঘটনাপ্রবাহ, নির্বাচন, দলীয় কার্যক্রম কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় তাদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রবাসে থেকেও তারা দেশের রাজনীতির সঙ্গে মানসিকভাবে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এমনকি তারা মাঝে মাঝে সিডনির রাস্তায় বাংলাদেশী স্টাইলে মিটিং মিছিলও করে থাকেন!
অন্যদিকে, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে ঘিরেও একটি সক্রিয় গোষ্ঠী রয়েছে। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উৎসব, মানবিক উদ্যোগ ও কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে।
তবে সমাজের আরেকটি অংশ রয়েছে, যারা কোনো বিশেষ কর্মকাণ্ডে সক্রিয় না হলেও চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। অন্যরা কী করছে, কে কোথায় যাচ্ছে, কোন সংগঠন কী করছে কিংবা কে কোন বিষয়ে আলোচনায় আছে—এসব নিয়েই তাদের আগ্রহ বেশি। তারা সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও সমাজের নানা বিষয় নিয়ে মন্তব্য ও আলোচনায় অংশ নেন।
মূলত, সিডনির বাংলাদেশি সমাজ একটি ক্ষুদ্র বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। এখানে যেমন নানা পেশা, মতাদর্শ ও আগ্রহের মানুষের সমাবেশ রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা ও জীবনবোধের প্রতিফলন। এই বৈচিত্র্যই প্রবাসী সমাজকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
তবে সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় সংগঠন নিয়ে গ্রূপিং অনেক বেশী! নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা বজায় রেখে, সবার ইতিবাচক ও গঠনমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই কমিউনিটি আরও শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে পারত। ব্যক্তিগত মতপার্থক্যকে পাশে রেখে যদি সবাই বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিত, তবে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের ভিত্তিতে একটি আরও সমৃদ্ধ ও অনুকরণীয় কমিউনিটি গড়ে তোলা সম্ভব হতো।
তবে সবচেয়ে বড় সুখবর এবং আশার আলো হলো, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারের অধিকাংশ সন্তানই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে বিভিন্ন সম্মানজনক ও প্রতিষ্ঠিত পেশায় সফলতার সঙ্গে নিয়োজিত আছেন। তারা তাদের অভিভাবকদের মতো কোন রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক সংগঠন বা কোন গ্রূপিং এর সাথে যুক্ত নয়! তাঁদের এই সাফল্য শুধু পরিবার নয়, সমগ্র প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য গর্ব ও অনুপ্রেরণার উৎস।
নোট : আপনি অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করলে, আপনার মতামত কমেন্টে জানাতে পারেন!




