অনেকের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিয়ে করিয়ে দিলেই তার রোগ সেরে যাবে। কিন্তু বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভুল। বিয়ে কোনো মানসিক রোগের চিকিৎসা নয়।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ছাড়া শুধু বিয়ে দিলে রোগীর সমস্যা কমার পরিবর্তে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে, যার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হবে, তার জীবনও অকারণে দুঃসহ, অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
তাহলে কি মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা বিয়ে করতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। মানসিক রোগ মানেই সুন্দর জীবন, ভালোবাসা বা সংসার গড়ার অধিকারের সমাপ্তি নয়।
যথাযথ চিকিৎসা, মানসিক স্থিতিশীলতা এবং পরিবারের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে একজন মানসিক রোগীও অন্য সবার মতোই সুখী দাম্পত্য জীবন গড়তে পারেন।
পৃথিবীতে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা মানসিক রোগের সঙ্গে লড়াই করে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ ও স্থিতিশীল জীবন ফিরে পেয়েছেন। তারা সফলভাবে বিয়ে করেছেন, কর্মজীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন, এমনকি কেউ কেউ নোবেল পুরস্কারও পেয়েছেন।
তাদের এই সাফল্যের পেছনে ওষুধের পাশাপাশি একজন সহানুভূতিশীল, ধৈর্যশীল ও ভালোবাসাময় জীবনসঙ্গীর অবদান ছিল অপরিসীম। কঠিন সময়ে সঙ্গীর সমর্থনই তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে।
আমাদের সমাজে অনেক সচেতন অভিভাবক আছেন, যারা প্রথমে সন্তানের মানসিক রোগের যথাযথ চিকিৎসা করান, ধৈর্য ধরে চিকিৎসা চালিয়ে যান এবং সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত সময়ে বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
এর ফলাফল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এমন অনেকেই আজ সুখী, স্থিতিশীল ও পরিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন। বহু রোগী মানসিক রোগ নিয়ন্ত্রণে এনে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করছেন।
অন্যদিকে, কিছু অভিভাবক রোগ গোপন করেন, চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেন না এবং মনে করেন বিয়েই সমস্যার সমাধান। এমন সিদ্ধান্তের পরিণতি প্রায়শই বেদনাদায়ক হয়। দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি, অবিশ্বাস, সংঘাত, বিচ্ছেদ এবং কখনো কখনো সহিংসতা বা মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটতে পারে।
পরে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অনেকে সন্তানের মানসিক রোগের কথা অস্বীকার করেন বা কবিরাজ, মোল্লা বা ভণ্ডপীরের পরামর্শের কথা বলেন। কিন্তু এসব বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই এবং এগুলো কখনোই চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না।
একটি বিয়ে কোনো চিকিৎসা নয়, বরং সুস্থ ও স্থিতিশীল দুজন মানুষের জীবনের বন্ধন। তাই এই বন্ধনের ভিত্তি হওয়া উচিত সততা, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং সঠিক চিকিৎসা, গোপনীয়তা বা প্রতারণা নয়।
আসুন, মানসিক রোগকে লজ্জা বা কুসংস্কারের চোখে না দেখে একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবে গ্রহণ করি। সময়মতো একজন সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নিই, নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় মনোচিকিৎসা চালিয়ে যাই এবং রোগীর পাশে ভালোবাসা ও ধৈর্য নিয়ে দাঁড়াই। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবারকে রক্ষা করতে পারে এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্নকে নতুন করে বাঁচার সাহস দিতে পারে।
ডা. মু. সাঈদ এনাম
সহযোগী অধ্যাপক
ব্রেইন স্নায়ু ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
ইন্টারন্যাশনাল ফেলো, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন




