যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম সংগঠন ‘নেশন অব ইসলাম’-এর দীর্ঘদিনের নেতা লুইস ফাররাখানের স্ত্রী খাদিজা ফাররাখান ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন। গত শনিবার (২৭ জুন) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সংগঠনের অনুসারীদের কাছে তিনি ‘মাদার খাদিজা’ নামেই পরিচিত ছিলেন।
তার মৃত্যুতে ‘নেশন অব ইসলাম’ গভীর শোক প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির শুরা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, ৭২ বছরের জীবনসঙ্গী এবং নেশন অব ইসলামের ফার্স্ট লেডি মাদার খাদিজা আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের আত্মনির্ভরশীলতার আদর্শে গড়ে ওঠা এই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।
বেটসি রস নামে জন্মগ্রহণ করা খাদিজা ১৯৫৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বোস্টনে লুইস ইউজিন ওয়ালকটকে (পরবর্তীতে লুইস ফাররাখান) বিয়ে করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। একই বছর ম্যালকম এক্সের প্রভাবে তার স্বামী ‘নেশন অব ইসলাম’-এ যোগ দেন। এই দম্পতির নয়টি সন্তান রয়েছে। শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মসজিদ মরিয়ম, যা নেশন অব ইসলামের প্রধান কেন্দ্র, সেখানেই ফাররাখান পরিবার দীর্ঘদিন বসবাস করতেন।
খাদিজা ফাররাখান কেবল একজন নেতার স্ত্রী ছিলেন না, তিনি নিজেও ছিলেন একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ১৯৯৭ সালে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘মিলিয়ন ওম্যান মার্চ’-এ ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, “একটি জাতি তার নারীদের চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠতে পারে না। আমাদের পুরুষ, নারী ও শিশু—সবাইকে নিয়ে একটি পরিবার হিসেবেই এগিয়ে যেতে হবে।”
মাদার খাদিজা ফাররাখানের মরদেহ আগামী বুধবার (১ জুলাই) ও বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শিকাগোর মসজিদ মরিয়মে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রাখা হবে। পরে শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল ১১টায় একই মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
‘নেশন অব ইসলাম’ এর যাত্রা শুরু হয় ১৯৩০ সালে। ওয়ালেস ডি. ফার্ড মুহাম্মদ নামে এক প্রচারক যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরের কৃষ্ণাঙ্গ এলাকায় এই আন্দোলন শুরু করেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল নিপীড়িত কৃষ্ণাঙ্গদের আল্লাহ ও নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে সচেতন করা। তিনি ইসলামের শিক্ষা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা এবং দাসত্বের সময়ের নাম-পরিচয় ও সংস্কৃতি পরিত্যাগের আহ্বানকে একত্রিত করে এই আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলেন।
পরবর্তীতে তার শিষ্য ইলিয়াহ মুহাম্মদ সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং এর প্রধান কার্যালয় শিকাগোতে স্থানান্তর করেন। তার নেতৃত্বে ‘নেশন অব ইসলাম’ একটি ছোট ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে বিদ্যালয়, সংবাদপত্র, খামার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসমৃদ্ধ একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়।
১৯৫২ সালে ম্যালকম এক্স সংগঠনে যোগ দিলে সদস্যসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং এক দশকের মধ্যে তা প্রায় তিন লাখে পৌঁছে যায়। ১৯৬৪ সালে কিংবদন্তি বক্সার মুহাম্মদ আলী ইসলাম গ্রহণ করে ‘নেশন অব ইসলাম’-এ যোগ দিলে সংগঠনটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
১৯৭৫ সালে ইলিয়াহ মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তার ছেলে ওয়ালেস মুহাম্মদ সংগঠনকে মূলধারার সুন্নি ইসলামের দিকে নিয়ে যান। তবে লুইস ফাররাখান এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ১৯৭৭ সালে শিকাগোতে নতুনভাবে ‘নেশন অব ইসলাম’ পুনর্গঠন করেন এবং কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার কর্মসূচি পুনরায় চালু করেন। এই পুনর্গঠিত সংগঠনকে শক্তিশালী করতে খাদিজা ফাররাখান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।




