#ইসলাম

দাম্পত্যে বিশ্বাসের সংকট: কারণ ও উত্তরণের উপায়

বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন এবং আল্লাহর এক মহান আমানত। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা তাদের তোমরা আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছো এবং আল্লাহর বিধান মোতাবেক তোমরা তাদের লজ্জাস্থানকে নিজেদের জন্য হালাল করেছো।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৯০৫)। এই হাদিস স্পষ্ট করে যে, বিবাহ কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস ও চরিত্র রক্ষার এক অঙ্গীকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় এই পবিত্র বন্ধনে বিশ্বাসের ভাঙন দেখা যায়, যা দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ডেকে আনে।

সৌদি আরবের বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও অধ্যাপক ড. খালিদ বিন মুহাম্মদ আশ-শাহরি এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। তিনি বলেন, সব ঘটনাই সম্পর্কের ‘খেয়ানত’ নয়। অনেক সময় আবেগবশত ছোট ঘটনাকেও বড় করে দেখা হয়, যা সম্পর্কে ফাটল ধরায়। আবার কিছু বিষয় ‘অনিচ্ছাকৃত’ বা ‘ভুল’ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে বিচক্ষণতা অবলম্বন করা জরুরি। এখানে ‘খেয়ানত’ বলতে দাম্পত্য সম্পর্কের এমন ইচ্ছাকৃত বিশ্বাসভঙ্গকে বোঝানো হচ্ছে, যা ভুল নয়, বরং সচেতনভাবে করা হয়েছে।

কেন ঘটে বিশ্বাসের ভাঙন?

বিবাহিত জীবনে বিশ্বাসভঙ্গের কারণগুলো প্রায়শই একপাক্ষিক হয় না। অনেক সময় দাম্পত্যসঙ্গী নিজের অজান্তেই অন্যজনকে ভুল পথে ঠেলে দিতে পারে। বাস্তব জীবনে সম্পর্ক বাঁচাতে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। কারণগুলো জানা থাকলে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। কয়েকটি প্রধান কারণ নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • ভালোবাসা ও আবেগীয় চাহিদার অভাব: যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা ও আবেগীয় চাহিদা পূরণ হয় না, তখন এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়, যা ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।
  • অতীতের সম্পর্কের প্রভাব: কারও কারও ক্ষেত্রে অতীতের সম্পর্কের স্মৃতি আগ্রাসী হয়ে ফিরে আসে এবং বর্তমান সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
  • স্ত্রীর আত্ম-অবহেলা: স্ত্রী যদি সন্তান ও ঘরের কাজে সম্পূর্ণভাবে ডুবে গিয়ে নিজের যত্ন নিতে ভুলে যান, তবে স্বামী তার মধ্যে আগের আকর্ষণ খুঁজে নাও পেতে পারেন।
  • দীর্ঘদিনের দূরত্ব: কর্মব্যস্ততা বা অন্যান্য কারণে দীর্ঘসময় একে অপরের থেকে দূরে থাকা হৃদয়ে বিভেদ তৈরি করতে পারে।
  • পারস্পরিক অসম্মান: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক অসম্মান সম্পর্ককে গোপন প্রতিশোধের দিকে ঠেলে দেয়।
  • খারাপ সঙ্গ: খারাপ বন্ধু বা সহকর্মীদের প্ররোচনা ভুল পথে চালিত করার অন্যতম কারণ।
  • অশ্লীলতার প্রভাব: অশ্লীল চলচ্চিত্র ও পর্নোগ্রাফি বাস্তব সম্পর্কের স্বাদ নষ্ট করে মানুষকে বিকৃত অনুভূতির দিকে ঠেলে দেয়।
  • একঘেয়ে জীবন: দাম্পত্য জীবনে একঘেয়েমি সম্পর্কের উষ্ণতা কেড়ে নেয়।
  • চরিত্রগত দুর্বলতা ও ধর্মীয় ভয়ের অভাব: যাদের চরিত্রগত দুর্বলতা আছে এবং ধর্মীয় ভয় কমে যায়, তারা অন্য নারী বা পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে দ্বিধা করে না।
  • নেশা ও মাদকদ্রব্য: নেশা, মদ বা মাদকদ্রব্য মানুষকে সিদ্ধান্তহীন ও বিবেকহীন করে তোলে, যা দাম্পত্য জীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
  • সঙ্গীর প্রতি ঘৃণা: যদি কেউ সঙ্গীর প্রতি মনে মনে ঘৃণা পোষণ করে, তবে সেই সম্পর্কের কোনো মজবুত ভিত্তি থাকে না এবং যেকোনো সময় বিশ্বাসভঙ্গ হতে পারে।
  • বৈবাহিক শিক্ষার অভাব: বৈবাহিক জীবনের প্রকৃত শিক্ষা, যেমন—কে কী চাইবে, কার কী দায়িত্ব—এসব না জানা সম্পর্ককে দুর্বল করে তোলে।
  • ভুল ধারণা: কিছু পুরুষ মনে করে স্ত্রী মানেই দাসী, যার কাজ শুধু রান্নাবান্না ও সন্তান প্রতিপালন। আবার কিছু নারী মনে করে তার কাজ শুধু সাজুগুজু করা আর স্বামী শুধু কামাই-রোজগার করে তাকে খুশি করবে। এই ধরনের মনোভাব সম্পর্ককে ভালোবাসার বদলে ‘শাসনযন্ত্রে’ পরিণত করে।

ফিরে আসার পথ

দাম্পত্য জীবনে বিশ্বাসঘাতকতা ঘটলে, বিশেষত যদি স্ত্রী ভুক্তভোগী হন, তবে আবেগতাড়িত হয়ে হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং প্রথমে একজন মুরুব্বি বা ফ্যামিলি থেরাপিস্টের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া উত্তম। তাদের কাছে সম্পর্কের আদ্যোপান্ত খুলে বলা প্রয়োজন, কারণ প্রতিটি পরিবারের গল্প আলাদা।

বিশ্বাসঘাতকতা যে পর্যায়েই হোক না কেন, প্রথমেই তালাকের মতো চরম সিদ্ধান্তে না গিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করা যেতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটু পরিশ্রম, আন্তরিকতা এবং আত্মসমালোচনা থাকলে সম্পর্ক আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় এই ধাক্কাই দাম্পত্য জীবনে নতুন সচেতনতা আনে, যা অনেকটা রোগের বিরুদ্ধে টিকার মতো কাজ করে এবং সম্পর্ককে আরও মজবুত করে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে দাম্পত্য সম্পর্ক সঠিক পথে ফেরার কিছু লক্ষণ থাকে। প্রথমত, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে বুঝে নেয়। এরপর পরস্পরের প্রতি যত্ন, ভালোবাসা ও খুশি করার মনোভাব নতুন করে গড়ে ওঠে। ভুলের ওপর বাড়াবাড়ি না করে ক্ষমাশীল হওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। সর্বদা মনে রাখতে হবে, কোনো সম্পর্ক সম্মান ছাড়া টিকে থাকে না। দাম্পত্য হলো সবচেয়ে গভীর মানবিক সম্পর্ক; তাই এখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক ছাড় এবং পারস্পরিক মমতা।

সুতরাং, সবার আগে কারণ উদ্ঘাটন করা অপরিহার্য। কারণ বোঝা মানেই সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যাওয়া। কেউ আবেগের বশে, কেউ চরিত্রের দুর্বলতায়, আবার কেউ ভুল বন্ধুবান্ধবের প্ররোচনায় খেয়ানত করে। তাই রোগ বুঝে তার চিকিৎসা করা প্রয়োজন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *