#জাতীয়

মন্ত্রী-ব্যবসায়ীর চাপে খোলা তেল বিক্রি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি: এএইচএম সফিকুজ্জামান

সরকার একাধিকবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেও খোলা ভোজ্যতেল বিক্রি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান অভিযোগ করেছেন যে, সরকারের একাধিক মন্ত্রী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক চাপ ও সমন্বয়ের অভাবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

রাজধানীর ক্যাব কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। ‘স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য ভিটামিনসমৃদ্ধ ভোজ্যতেল সহজলভ্যকরণে স্বল্পমূল্যের প্যাকেজিং: জনমত সৃষ্টিসংক্রান্ত আলোচনা সভা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এএইচএম সফিকুজ্জামান।

সফিকুজ্জামান জানান, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই খোলা তেল বিক্রি বন্ধের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তের পর ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট থেকে এটি কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদেরও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর যখন তিনি ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন খোলা তেল বন্ধে পদক্ষেপ নিতে গেলে তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন যে তিনি সরকারবিরোধী কাজ করছেন কিনা। সফিকুজ্জামান বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, সরকার আইন প্রণয়ন করলেও এর বাস্তবায়নে রাজনৈতিক চাপ ও বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব কাজ করে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ও চাপের কারণে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হয়েছে।

ক্যাবের সভাপতি অভিযোগ করেন, দেশের ভোজ্যতেলের বাজার কয়েকটি বড় রিফাইনারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব খাটিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে উৎসব বা অতিরিক্ত চাহিদার সময়ে দাম বাড়ায়। তিনি জানান, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। হাতেগোনা পাঁচ-ছয়টি বড় কোম্পানি বাজারের প্রায় ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।

সফিকুজ্জামান ব্যাখ্যা করেন, প্রতিদিন দেশে প্রায় ৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকে। এই বড় কোম্পানিগুলো প্রতিদিন ১.৫ থেকে ২ লাখ টন তেল সরবরাহ করে। তারা সুযোগ বুঝে সিন্ডিকেট করে সরবরাহ বন্ধ করে দিলেই বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং সরকারকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। এর ফলস্বরূপ ধাপে ধাপে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়, যা এখনো অব্যাহত আছে।

তিনি আরও বলেন, প্যাকেটজাত তেলের ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) উল্লেখ থাকায় এর ওপর নজরদারি সহজ। কিন্তু খোলা তেলের ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। অনেক সময় বোতলজাত তেল খুলে বেশি দামে খোলা তেল হিসেবে বিক্রি করে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সফিকুজ্জামান সরকারকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে খোলা তেল বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সাথে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ, বাজার তদারকি জোরদার এবং ব্যবসায়ীদের সাথে সমন্বয় করে একটি কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপরও তিনি জোর দেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *