মানুষের জীবনে প্রকৃত শান্তি, সফলতা এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম সহজ ও কার্যকর উপায় হলো জিকির। এটি কেবল মুখে উচ্চারিত কিছু শব্দ সমষ্টি নয়, বরং অন্তরের প্রশান্তি, গুনাহ মাফ, বিপদ থেকে সুরক্ষা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহৎ ইবাদত। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এমন অনেক সংক্ষিপ্ত জিকিরের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়মিত পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই কল্যাণময় হয়ে উঠতে পারে।
এখানে এমন পাঁচটি অমূল্য জিকির তুলে ধরা হলো, যা প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে একজন মুসলিমের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এই জিকিরগুলো আপনার জীবনকে নতুন দিশা দিতে যথেষ্ট।
১. সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি
উচ্চারণ: ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।’
অর্থ: ‘আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তারই।’
ফজিলত: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “যে ব্যক্তি দিনে একশতবার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ বলবে, তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়।” (বুখারি ৬৪০৫, মুসলিম ২৬৯১)
২. আস্তাগফিরুল্লাহ
উচ্চারণ: ‘আস্তাগফিরুল্লাহ।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’
ফজিলত: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি বললাম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।” (সুরা নুহ: আয়াত ১০–১২)
৩. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
উচ্চারণ: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’
অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।’
ফজিলত: হাদিসে পাকে এসেছে, “সর্বোত্তম জিকির হলো— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” (তিরমিজি ৩৩৮৩)
৪. আল্লাহুম্মা মাগফির লি
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা মাগফির লি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
ফজিলত: রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই সিজদার মাঝখানে এই দোয়াটি পাঠ করতেন। এর পূর্ণ রূপ হলো: ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে হিদায়াত দিন, আমার অভাব পূরণ করুন, আমাকে নিরাপদ রাখুন এবং আমাকে রিজিক দান করুন।’ (তিরমিজি ২৮৪, আবু দাউদ ৮৫০)
৫. আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা
উচ্চারণ: ‘আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত-তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীর আশ্রয় গ্রহণ করছি তার সৃষ্ট সব কিছুর অনিষ্ট থেকে।’
ফজিলত: হাদিসে বর্ণিত, “যে ব্যক্তি কোনো স্থানে অবতরণ করে এই দোয়া পাঠ করবে, সে স্থান ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত কোনো কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।” (মুসলিম ২৭০৮)
কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জিকিরের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন:
- “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা ঘোষণা কর।” (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৪১–৪২)
- “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (সুরা আর-রাদ: আয়াত ২৮)
আল্লাহর জিকির এমন এক ইবাদত, যার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়, স্থান বা বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না। অল্প কয়েকটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসংখ্য বরকত, রহমত ও সওয়াব। তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও এই পাঁচটি জিকিরকে নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়া উচিত। নিয়মিত জিকির হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে, গুনাহ মাফের পথ উন্মুক্ত করে, বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং মানুষকে আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে তোলে। যে জিহ্বা সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত প্রশান্তি ও সফলতার অনাবিল স্বাদ লাভ করে।




